# কুকুর-বিড়াল নিয়ে রিসোর্টকর্মীরা নিরাপদে পালালেও অতিথিদের সজাগ করলেন না কেন ?
# মরদেহ এবং তালিকা মিলেই ঘটনায় নিখোঁজ স্কুলশিক্ষিকা মুক্তা কোথায়?
কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ সংলগ্ন পাটুয়ারটেক এলাকার টুপটুপ রেস্তো অ্যান্ড রিসোর্টে ভয়াবহ আগুনের ঘটনায় ঘিরে দুই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট এবং তদন্ত কমিটি। যে দুইটি প্রশ্ন ঘিরেই ভয়াবহ আগুনের ঘটনা নিয়ে তৈরি হয়ে রহস্যও। মুলত এই দুইটি প্রশ্নের উত্তর মিলেই জট খুলবে আগুনের ঘটনাটি নিছক দূর্ঘটনা নাকি পরিকল্পিত?
আর সেই দুই প্রশ্ন হলো, আগুনের ঘটনার পর ওই প্রতিষ্ঠানে থাকা কুকুর ও বিড়াল নিয়ে রিসোর্টটিতে অবস্থানকারি কর্মকর্তা কর্মচারিরা নিরাপদে পালালেও অতিথিরা সজাগ করলেন না কেন ? অপর প্রশ্নটি হল, ঘটনার পর মরদেহ উদ্ধার হয়েছে ১০ জনের, কিন্তু স্বজনদের দেয়া তথ্য মতে নিখোঁজ ১১ জন। সার্বিক বিবেচনায় এই ঘটনায় ঢাকার সাভারের ‘স্বপ্ন বিলাস স্কুল’ নামের একটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষিকা এবং ছাত্রদল নেতার স্ত্রী নাসরিন আক্তার মুক্তাই নিখোঁজ রয়েছে। সেই নিখোঁজ মুক্তা কোথায়, জীবিত না মৃত?
১৭ অক্টোবর সকাল ৭টার দিকে পাটুয়ারটেক এলাকার রিসোর্টটিতে আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট সকাল ৮টার দিকে উদ্ধার ও আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজ শুরু করে। সকাল ১০টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। পরে শুরু হয় উদ্ধার অভিযান। ফায়ার সার্ভিসকে সহযোগিতা করেন বিজিবি, পুলিশ ও কোস্টগার্ডের সদস্যরা। শেষ পর্যন্ত ওই রিসোর্ট থেকে একে-একে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করেছে ফায়ার সার্ভিস। একই সঙ্গে আহত হয়েছে ৭ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ৭ জন। এ ঘটনায় ইতিমধ্যে পুলিশ মামলা করেছে, গঠিত হয়েছে তদন্ত কমিটি। উদ্ধার ১০ জনের মরদেহ এখনও কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের মর্গে রয়েছে। যাদের এবং স্বজনদের ডিএনএ- পরীক্ষার নমুনা সংগ্রহ করে পাঠানো হয়েছে ঢাকায়।
# আগুনের পর কুকুর-বিড়াল নিয়ে রিসোর্টকর্মীদের নিরাপদে পালাতে দেখেছে প্রত্যক্ষদর্শীরা :
ঘটনায় পর একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী এবং স্থানীয় লোকজনের দেয়া তথ্য মতে, বিকট একটি বিস্ফোরণের শব্দের পর আগুনের সূত্রপাত হয়। আগুনের সূত্রপাত হওয়ার পর রিসোর্টটিতে অবস্থান নেয়া কয়েকজন পর্যটককে বের হতে দেখা যায়। এরপরই রিসোর্টটিতে থাকা অন্তত ৫ জন কর্মীকে ২টি কুকুর এবং ৪টি বিড়ালকে সঙ্গে নিয়ে বের হয়ে দ্রুত পালিয়ে যেতে দেখেছেন।
স্থানীয়দের দেয়া তথ্য মতে, রিসোর্টটির মালিক দুই জন। একজন তানভীর আহমদ এবং অপরজন নিয়াজ মোরশেদ। যেখানে মালিক ভানভীরের পোষা ২টি কুকুর এবং ৪ টি বিড়াল ছিল। যেগুলো রাখা হতো মালিকের কক্ষ হিসেবে পরিচিত রিসোর্টের দ্বিতীয় তলায়। আর সেই প্রাণীগুলো নিয়ে দ্রুত উদ্ধার করে রিসোর্টের বাইরে এসে চলে যেতে দেখা যায়।
এসব কর্মীদের প্রাণীগুলো নিয়ে দ্রুত চলে যেতে দেখা গেলেও কক্ষে আটকে পড়া পর্যটকদের সজাগ করতে বা উদ্ধারে তৎপরতা ছিলনা। ফলে আগুনের ভয়াবহতা বেড়ে গেলে ১০ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।
এ ঘটনায় কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট (এডিএম) তাসনীম জাহানকে প্রধান করে ৭ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। যারা রবিবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় লোকজনদের সাথে কথা বলেছেন। কথা বলেছেন রিসোর্টটি থাকা জীবিত এবং আহতদের সাথে এবং নিহতদের স্বজনদের সাথে।
যেখানে স্থানীয় এক যুবক জানিয়েছেন, এসব পোষা প্রাণী সঙ্গে নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির মালিককে ঘুরা-ফেরা করতে দেখতেন। রিসোর্ট কর্মীদের ওই সব পোষা প্রাণীকে রক্ষা করে নিজদের নিরাপদে পালাতে দেখা গেলেও ভেতরে থাকা পর্যটকদের রক্ষায় কোন ভূমিকা দেখা যায়নি। আগুনের ভয়াবহতা বাড়লে কয়েকজনকে লাফিয়ে বের হতে দেখা গেলেও অন্যরা আটকে পড়েছিল।
তদন্ত কমিটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আগুনের সূত্রপাত, রিসোর্টটির কর্মীদের সকলকে নিরাপদে বের হওয়া সহ অন্যান্য কিছু বিষয় এখন তদন্ত কমিটির সামনে এসেছে। এগুলো আরও যাচাই বাছাই করা হচ্ছে।
কমিটির প্রধান এডিএম তাসনীম জাহান জানান, অনেক প্রত্যক্ষদর্শী ঘটনার বিষয়ে বক্তব্য প্রদান করেছেন। প্রাপ্ত তথ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির কি কি ধরণের অনিয়ম রয়েছে, ওই সময় প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের গাফেলতী কি ছিল তার সার্বিক তথ্যাদি পাওয়া গেছে। এসব তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হবে।
# মরদেহ এবং তালিকা মিলেই ঘটনায় নিখোঁজ স্কুলশিক্ষিকা মুক্তা কোথায়?
শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকাল ৭টার দিকে মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন পাটুয়ারটেক এলাকার রিসোর্টটিতে আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট সকাল ৮টার দিকে উদ্ধার ও আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজ শুরু করে। সকাল ১০টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। পরে শুরু হয় উদ্ধার অভিযান। ফায়ার সার্ভিসকে সহযোগিতা করেন বিজিবি, পুলিশ ও কোস্টগার্ডের সদস্যরা। শেষ পর্যন্ত ওই রিসোর্ট থেকে একে-একে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করেছে ফায়ার সার্ভিস। একই সঙ্গে আহত হয়েছে ৭ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ৭ জন।
ওই রিসোর্ট ঘটনার সময় অবস্থানকারির বিবেচনায় নিখোঁজের তালিকায় রয়েছেন ১১ জন। স্বজনদের দাবি প্রেক্ষিতে ওই ঘটনায় নিখোঁজ ১১ জন হলেন, বনশ্রীর বাসিন্দা মো. আশিকুল ইসলামের স্ত্রী ইসরাত জাহান মালিহা (৩০), ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির মেলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩), জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের লায়লা জাহান নাবিলা (২৭), নাফিসতা মীম (২৭), নাফিজের বড় বোন ফারিয়া কবির (৩৩), তার পাঁচ বছর বয়সী ভাগনে ফায়িজান আহম্মেদ, ঢাকার সাভারের ‘স্বপ্ন বিলাস স্কুল’ নামের একটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক নাসরিন আক্তার মুক্তা (২৯), যশোরের নাহিদুর রহমান (৪১), তার স্ত্রী আফসানা মতিন তানজি (৩৬), দুই সন্তান রুজাইনা ইনায়া (৭) ও সুনাইনা ইহানা (৩)।
ঘটনায় উদ্ধার তৎপরতায় থাকা কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মোরশেদ হোসেনের দেয়া তথ্য মতে, আগুনের ঘটনায় প্রথমে দুইটি কক্ষ থেকে ৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সন্ধ্যার পর আরেকটি কক্ষ থেকে দুইটি শিশু সহ মিলে ৪ জনের মরদেহ।
ফায়ার সার্ভিসের দেয়া তথ্য এবং নিখোঁজ স্বজনদের দেয়া তথ্য মতে, প্রথম ৬ জনের মরদেহটি সমুহ একই সঙ্গে ভ্রমণে আসা ৬ জন নিকটাত্মীয়দের বলে শতভাগ শনাক্ত বলে ধরে নিচ্ছেন প্রশাসন। এরা হলেন, নশ্রীর বাসিন্দা মো. আশিকুল ইসলামের স্ত্রী ইসরাত জাহান মালিহা (৩০), ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির মেলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩), জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের লায়লা জাহান নাবিলা (২৭), নাফিসতা মীম (২৭), নাফিজের বড় বোন ফারিয়া কবির (৩৩), তার পাঁচ বছর বয়সী ভাগনে ফায়িজান আহম্মেদ।
সন্ধ্যার পর উদ্ধার হওয়া একই কক্ষের ২ শিশু সহ ৪ জনের মরদেহ যশোরের নাহিদুর রহমান (৪১), তার স্ত্রী আফসানা মতিন তানজি (৩৬), দুই সন্তান রুজাইনা ইনায়া (৭) ও সুনাইনা ইহানা (৩) এর বলে শনাক্ত।
ডিএনএ পরীক্ষার পর তা আরও নিশ্চিত করা যাবে।
ফলে এ ঘটনায় নিখোঁজ হিসেবে প্রশাসন নিশ্চিত হয়েছে শিক্ষিকা এবং ছাত্রদল নেতার স্ত্রী নাসরিন আক্তার মুক্তাকে। যার মোবাইল ফোন নম্বর তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার কাজ শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন তদন্ত কমিটির প্রধান এডিএম তাসনীম জাহান।
তিনি জানান, নিখোঁজ একজন অগ্নিকাণ্ডের সময় রিসোর্টের ভেতরে ছিলেন, নাকি বাইরে ছিলেন, তা নিশ্চিত হতে পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) ও তদন্তকারী দল কাজ করছে। নিখোঁজ ব্যক্তিদের মুঠোফোন নম্বরের নেটওয়ার্ক লোকেশন ও অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
মুক্তার স্বামী ঢাকা জেলা ছাত্রদলের সহ-সভাপতি বাদল হোসেন জানান, অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত রিসোর্টটিতে ফয়সালের স্ত্রীসহ তিন বান্ধবী উঠেছিলেন ও সেখানে তারা অবস্থান করছিলেন। সকালে তার দুই বান্ধবী কক্ষ থেকে কিছু সময় আগেই বাইরে বের হয়েছিলেন। তবে ওই সময় কক্ষে থাকা তার স্ত্রী নাসরিন আক্তার ভেতরে আটকা পড়েন। কিন্তু তারও কোন হদিস মিলেনি এখনও।
উখিয়া থানার ওসি আতিকুর রহমান মজুমদার জানান, প্রতিষ্ঠানের মালিকসহ ৪ জনের নাম উল্লেখ করে ১৯ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে এই মামলাটি দায়ের করা হয়। এ মামলায় ম্যানেজার মোহাম্মদ সুমনও আসামি। ইতিমধ্যে সুমনকে পুলিশ আটক করে এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনার তদন্তের প্রয়োজনে সুমনকে ৭ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে আবেদন করা হয়েছে। রিমান্ড মঞ্জুর হলে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। একই সঙ্গে অভিযুক্ত অন্যান্যদের ধরতেও কাজ করছে পুলিশ। তাদের ধরতে পারলে আরও তথ্য নিশ্চিত হওয়া যাবে।
ওসি বলেন, নিখোঁজের বিষয়টি নিয়ে কাজ চলছে। ফায়ার সার্ভিসের পক্ষে রিসোর্টটি কয়েক দফায় তল্লাশী চালানো হয়েছে। কিছু আলামত পাওয়া যায়নি। ফলে প্রযুক্তির সহায়তাও নেয়া হচ্ছে। নিখোঁজ জন পুড়ে গেছে, না কি জীবিত অন্য কোথাও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে। পুলিশ কাজ করছে। বিস্তারিত তথ্য পেলে জানানো হবে।